পেপাল মাফিয়াদের গল্প

Pepal-Mafia

পেপাল মাফিয়াদের গল্প

পেপাল এই শব্দটা আমাদের সবার কাছে খুবই পরিচিত একটা শব্দ। কিন্তু পেপাল এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে “পেপাল মাফিয়া” ইতিহাস। কি? “মাফিয়া” শব্দটা শুনে ঘাবড়ে গেলেন নাকি? ভাবছেন পেপাল এর সাথে ভিন্ন জগতের শব্দ “মাফিয়া” এই শব্দটা একসাথে মিলল কিভাবে? তাহলে চলুন, সেই গল্পই আজ আপনাদের সাথে করা যাক।

আমরা যারা অনলাইনে কাজ করি এবং অনলাইনে ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট বা ট্রানজেকশন করি তারা অবশ্যই পেপাল সম্পর্কে জানি। পেপাল বর্তমান অনলাইন দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও স্মার্ট পেমেন্ট গেটওয়ে। এই পেপাল আজকের পেপাল হয়ে উঠার পেছনে যাঁদের অবদান তাদেরকে পেপাল মাফিয়া বলা হয়। পৃথিবীতে এর থেকে ভালো মাফিয়া এই পর্যন্ত জন্মই হয়নি। 

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই, আমাদের দেশে পেপাল আসার কথা বারবার বলা হলেও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে পেপাল চালু হয়নি।

পেপ্যাল এর শুরুর গল্প

সময়টা ছিল ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাস, ম্যাক্স লেভচিন, পিটার থিল ও লুক নোসেক দ্বারা অনলাইন ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালে এর নাম ছিল “কনফিনিটি” যা বর্তমানে আমাদের কাছে PayPal নামে পরিচিত। এরপর ২০০০ সালে কনফিনিটি X.COM এর সাথে মিলিত হয় যেটি ছিল ইলন মাস্ক এর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটা অনলাইন ব্যংকিং কোম্পানি। 

২০০২ সালের $১.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে eBay পেপাল কিনে নেয়। কেননা eBay এর ম্যাক্সিমাম কাস্টমার ছিল PayPal User.

পেপ্যাল তৈরির পিছনে যেসব কারিগর ছিল,পরবর্তীতে তারা তাদের শেয়ারের ডলার দিয়ে স্পেসএক্স, টেসলা মটরস, ইউটিউব, লিংকডইন, স্লাইড শেয়ার এর মত প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। যারা বর্তমানে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের মালিক।

পেপাল বিক্রির পর প্রত্যেকে তার নিজস্ব জায়গা থেকে এমনভাবে সাফল্যের চূড়ায় উঠেছেন যে, এর কারণেই হয়তো তাদের পেপ্যাল মাফিয়া বলা হয়। যারা পেপাল মাফিয়া নামে পরিচিত, তাঁরা এখন সিলিকন ভ্যালিতে বসবাস করে এবং তারা এখন সিলিকন ভ্যালীতে সবচেয়ে বড় ধনী একটা গ্রুপ।

চলুন তাহলে পেপাল মাফিয়াদের সম্পর্কে জেনে আসি।

(১) জাওয়েদ করিম

জাওয়েদ করিম। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তরুণ। তার জন্ম ১৯৭৯ সালে জার্মানিতে, বর্তমানে তিনি আমেরিকার নাগরিক। তিনি পেপালের রিয়েল-টাইম ইন্টারনেট জালিয়াতি বিরোধী সিস্টেম নিয়ে গবেষণা করেন। এবং তিনি সফল হয়েছিলেন।

 তিনি ২০০৫ সালে সাদ হারলি ও স্টিভ চেনের সঙ্গে মিলে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে ইউটিউবে আমরা  সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি। নাটক, সিনেমা সব কিছুই এখন ইউটিউবে দেখি। ইউটিউবে আপলোড করা প্রথম ভিডিও জাওয়েদ করিম এর। যার নাম ছিল Me at the Zoo যা ২০০৫ সালে আপলোড করা হয়। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে গুগল $1.65 বিলিয়ন ডলারে ইউটিউব কিনে নেয়। 

বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় $140 মিলিয়ন ডলার। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)

(২) জেরেমি স্টপেলম্যান

জেরেমি স্টপেলম্যান মূলত একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পেপালে যোগদান করেন। তখন পেপাল এক্স.কম নামে ছিল। এবং পরে তিনি পেপালের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। ২০০৩ সালে eBay $১.৫ বিলিয়ন ডলারে পেপ্যাল কেনার কিছুদিন পরে তিনি পেপাল ছেড়ে দেন। পেপাল ছাড়ার পড়ে তিনি তার বন্ধু রাসেল সিমন্স কে সাথে নিয়ে একটা অনলাইন রিভিউ সাইট তৈরি করেন। যার নাম হলো Yelp. এটি বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন রিভিউ সাইট। পরবর্তীতে এটি লিমিটেড কোম্পানি হয়ে যায়।

বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় $111-$222 মিলিয়ন ডলার। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)

(৩) আন্দ্রু ম্যাককর্ম্যাক

আন্দ্রু ম্যাককর্ম্যাক ২০০১ সালে পেপালে যোগদান করেন। তিনি পিটার থিয়েল (Peter Thiel) এর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। পেপাল ছাড়ার পর সান্স ফ্রান্সিস্কোতে একটি রেস্টুরেন্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন।

(৪) প্রেমল শাহ

প্রেমল শাহ দীর্ঘদিন পেপালে প্রডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পেপাল ছাড়ার পর তিনি Kiva এর প্রেসিডেন্ট হন। মূলত কিভা একটা অলাভ জনক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্থ ধার দেয়।

(৫) লুক নোসেক

লুক নোসেক পেপালের অন্যতম কো-ফাউন্ডার এবং মার্কেটিং এন্ড স্ট্রেটেজির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৫ সালে তিনি তার বন্ধু থিয়েল ও হাওরির সঙ্গে Founders Firm গঠন করেন।

(৬) কেন হাওরি

কেন হাওরি পেপালের একজন কো-ফাউন্ডার ছিলেন। তিনি পেপালের শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পেপালের প্রধান ফাইনান্সিয়াল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পপ এক্সপার্ট নামে একটা লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। যা বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন পরামর্শ পেতে সাহায্য করে।

(৭) ডেভিড স্যাক্স

স্যাক্স পেপালের অন্যতম প্রধান অপারেটিং অফিসার ছিলেন। পেপ্যাল বিক্রির পর তিনি এসব ছেড়ে হলিউডে পাড়ি জমান। সেখানেও তিনি সফল মুভি নির্মাণ করেন এবং পুরুস্কার পান।

(৮) পিটার থিয়েল

পিটাল থিয়েল হলো অন্যতম পেপাল মাফিয়া। তিনি পেপ্যাল এর কো-ফাউন্ডার এবং সিইও ছিলেন। পিটার ক্লারিয়াম ক্যাপিটাল গঠন করে। তিনি ফেসবুকেও বিনিয়োগ করেছিলেন। তাই বলা হয় পিটার যদি তখন ফেসবুকেও বিনিয়োগ না করতেন তাহলে হয়তো আমরা আজকের এই ফেসবুক পেতাম না।

বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায়  $2.2 বিলিয়ন ডলার। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)

(৯) কিথ রাবোইস

কিথ রাবোইস ২০০০ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পেপালে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিজনেস ডেভলপমেন্ট, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স এবং পলিসি বিভাগে ছিলেন। সেখানে তার সুখ্যাতি ছিল। বর্তমানে কিথ ভেঞ্চার ক্যাপিটালের একজন পার্টনার এবং Yelp ও Xoom এর বোর্ড অব ডিরেক্টর।

বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায়  $1 বিলিয়ন ডলার। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)

(১০) রিড হফম্যান

রিড হফম্যান পেপালে চিফ অপারেটিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতেন। পেপাল যখন বিক্রি হয় সেই সময় তিনি পেপালের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ডের দায়িত্বে ছিলেন। পেপাল ছাড়ার পরে তিনি চিন্তা করেন একটা সোশ্যাল মিডিয়া সাইট বানাবেন যেখানে মানুষ নিজেদের কাজ কর্ম ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে কথা বার্তা বলবে। সেই ধারণা থেকেই তিনি লিংকডইন (LinkedIn) তৈরি করেন। বর্তমানে লিংকডইন মাইক্রোসফট এর একটা প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায়  $3.9 বিলিয়ন ডলার। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)

(১১) ম্যাক্স লেভচিন

ম্যাক্স পেপালের অন্যতম কো-ফাইন্ডার ও প্রধান টেকনোলজি অফিসার ছিলেন। পেপালের এন্টি-ফ্রড সিস্টেম উন্নতিকরণে তার অবদান আছে। পেপাল বিক্রির পর লেভচিন তার ভাগের যে ডলার পান তা দিয়ে তিনি স্লাইড শেয়ার প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায়   $300 মিলিয়ন ডলার। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)

(১২) রোলফ বোথা

রোলফ পেপালের প্রধান ফিনান্সিয়াল অফিসার ছিলেন। তিনি তার গ্রাজুয়েট শেষ হওয়ার আগেই যোগ দিয়েছিলেন কর্পোরেট ডেভলোপমেন্টের পরিচালক হিসেবে। বর্তমানে বোথা Sequoia Capital এর একজন পার্টনার এবং টাম্বলার, জুম (XOOM) এর মত কোম্পানীসহ ১৩টি কোম্পানীর বোর্ড মেম্বার।

(১৩) রাসেল সিমন্স

রাসেল সিমন্স পেপালের লিড সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট ছিলেন। পেপাল ছাড়ার পর জেরেমি স্টপেলম্যান এর সাথে Yelp প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রধান টেকনোলজি অফিসার হন। ২০১২ সালে সিমন্স Learnirvana প্রতিষ্ঠা করেন যেটা ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ভাষা শিখতে সাহায্য করে।

(১৪) এলন মাস্ক

ইলন মাস্ক তার ইমেইল পেমেন্ট সিস্টেম প্রতিষ্ঠান এক্স.কম কে পেপালের কাছে বিক্রি করে দেন এবং পেপালের সবচেয়ে বড় শেয়ার হোল্ডার হয়ে যান। তিনি ছিলেন পেপালের অন্যতম বোর্ড মেম্বার। পেপাল eBay এর কাছে বিক্রি করে তিনি তার শেয়ারের ১৬৫ মিলিয়ন ডলার পান। ২০০২ সালে এলন মাস্ক SpaceX প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে SpaceX এর সিইও এবং সিটিও এবং প্রধান ডিজাইনার পদে আছেন। তিনি বিখ্যাত ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাণ কোম্পানী টেসলার সিইও। এলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৯৭ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালের শুরুর দিকে এমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস কে পিছনে ফেলে বিশ্বের সেরা ধনী হয়েছিলেন।

এদিকে পেপালের জনপ্রিয়তা কিন্তু একটুও কমেনি। eBay যে কোম্পানিকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনেছিল আজ সেই কোম্পানির ভ্যালু ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

পেপালে মাফিয়ার গল্প থেকে আমরা একটা জিনিস বুঝলাম সেটা হলো, তারা সবাই খুব সাহসী ছিলো। কোন সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পেতেন না। সবসময় সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন। মনে হয় এই সাহসী মনোভাব এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল ইচ্ছাই হয়তো তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

ব্যাপার টা দারুণ না? এক পেপাল বিক্রি হওয়াতে আমরা দারুণ সব জনপ্রিয় প্রযুক্তি হাতে পেয়েছি এবং দৈনন্দিন জীবনে এইসব সোশ্যাল মিডিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে। বর্তমানে এমন এক অবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও চলতে পারি না। পেপাল মাফিয়াদের বিশেষ ধন্যবাদ দেয়াই যায় এর জন্য। আসলে বর্তমান টেক দুনিয়ায় অনেক নতুন কিছু এই পেপাল মাফিয়াদের হাত ধরে আমাদের কাছে এসেছে।

সুত্রঃ বিজনেস ইনসাইডার, উইকিপিডিয়া, এবং ইন্টারনেট।

Kawsar-Hossain

Kawsar Hossain

হ্যালো, আমি কাওছার হোসেন। খুব সাধারন একজন মানুষ। আমি সবসময় চেষ্টা করি নতুন কিছু শিখতে এবং সেই জিনিস গুলা সবার সাথে শেয়ার করতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.